সন্তপ্ত হৃদয়ের অনশ্বর স্মৃতি
বন্ধু সেতো শুধু হৃদয়ের বন্ধন।আর প্রিয় ‘বন্ধু’ সেতো হৃদয়ের দৃঢ় বন্ধন দমকা হাওয়ায় ছিন্ন হতে পারে বন্ধুর বাঁধন। কিন্তু সিডর, নার্গিস ও আইলার মত বা তার চেয়েও শক্তিশালী কোন ঘূর্ণিঝড় এলেও প্রিয় বন্ধুর এই মধুর বন্ধন ছিন্ন হতে পারে না। জীবনের বাঁকে বাঁকে শত সহস্র বন্ধু আসে। কিন্তু প্রিয় বন্ধু? জীবনে খুব কমই আসে। দিন হাড়িয়ে যায় রাতের মাঝে, রাত হারিয়ে যায় দিনের মাঝে। আর প্রিয় বন্ধু হারিয়ে যায় তার প্রিয় বন্ধুর মাঝেই। একসময় একসাথে বিদ্যালয়ে গিয়েছি, একসাথে খেলেছি, বৈশাখী মেলায় গিয়েছি, নাগর দোলায় চড়েছি, দুজনে মেলায়! বাতাসা কিনে খেয়েছি, ঘুড়ি উড়ায়েছি, সুখ-দুঃখের কথা বলেছি। কিন্তু সেই প্রিয় বন্ধু আজ কোথায়? যান্ত্রিক শহর ঢাকার পিচঢালা পথে হারিয়ে গেছে প্রিয় বন্ধু সজল। কি নির্মম ঘটনা। ভাবতেই গা শিহরে উঠে। আহা! বেচারা কি জন্যই বা ঢাকায় এসেছিলো? মাত্র দুই দিন হলো সে ঢাকায় এসেছে। আগামী কাল তার বাড়ি ফেরার কথা ছিলো। কিন্তু… সব! ভাগ্যের লিখন। জরুরি কোন প্রয়োজন ছিল! না। আমাকে আসতে বলেছিল, আমি আসতে পারিনি। আজ নিজেকে বড় অপরাধী মনে হচ্ছে। কেন আমি ওর সাথে গেলাম না? এটাই কি বন্ধুর পরিচয়? এই তো কিছু দিন পূর্বে ওর। সাথে কথা হলো। সুখ-দুঃখের আলোচনা। হলো। ওর রিমির কথাও আলোচনার বিষয়। ছিলো। আমি ওর বন্ধু। রিমি ওর প্রিয়। ভালোবাসা।
জোহরের নামায আদায় করে সবেমাত্র খেতে! বসেছিলাম তখনই অপরিচিত এক নম্বর! থেকে শুনতে পেলাম এই নির্মম ইতিহাস। রিমিকেও খবরটা জানালাম। ও ছুটে এসে আমার বুকে আছরে পড়লো। ভাইয়া আমার কি হবে? এর কোন সৎ জবাব আমি দিতে পারি নি। দু জোড়া চোখের বাঁধ ভাঙা জলে ভেসে গেল একজোড়া বুক। ছুটে এলো সজলের। আম্মা। রিমি আছড়ে পড়লো শ্বাশুড়ির বুকে।। আম্মা বলুন আজ আমার কি হবে? পরিবেশটা মুহূর্তেই ভারি হয়ে উঠলো। এখনো জানি না সজল বেঁচে আছে কিনা? ওর আম্মা বললো বাবা আমার সজল কই? ওকে এনে দাও। রিমি! চিৎকার দিয়ে বললো ভাইয়া ও কে এনে দাও। হোক সে পঙ্গু। তবুও এনে দাও। আমি আমার পঙ্গু স্বামীর সেবা করেই জনম পার করে দেব। ওকে ফিরিয়ে আনো। আমি পারিনি তাদেরকে কোন শান্তনা দিতে। কি শান্তনা দেব? আমি নিজেকেই সামলাতে পারছিলাম না। চললাম। রিমিকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে। আমি জানি। রিমিকে আনা ঠিক হয়নি। সজল সে বেঁচে নেই। এটাই হয়তো সত্য। সেখানে নিজেকেই ঠিক রাখতে পারবো কিনা সন্দেহ। আর এই রিমিকে সামলাবে কে? কি নির্বোধের মত কাজই না আমি করলাম। রিমিও নাছোড় বান্দা। তাই আনতে বাধ্য হলাম। এই ছোট্ট মেমোরীতে কত সহস্র স্মৃতিই না ধারণ করে আছে। গাড়ি চলছে তার আপন গতিতে। তার গতি কত জানি না। তবে আমার কাছে মনে হচ্ছে খুবই। । ধীর গতিতে যাচ্ছে গাড়িটি। ড্রাইভারকে বললাম ওস্তাদ গতি কত কি. মি. বেগে যাচ্ছে? সে যা বললো তা আমার নিকট পছন্দ হলো না। বললাম ওস্তাদ একটু বাড়িয়ে দিলে হয় না? ড্রাইভার শুধু একবার লুকিং গ্লাস দিয়ে আমার দিকে চেয়ে বললো আপনার কি মাথা! ঠিক আছে? আসলেই এখন আমার মাথা ঠিক নেই। পাশেই রিমি বসা। অশ্রুতে ওর বুকটা ভেসে গেছে। ওকে শান্তনা দানের উদ্দেশে। বললাম রিমি। বলতে পাবো? আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন দুজনে ঐ সেই হিজল! গাছটির নিচে কত দিন চড়ুইভাতি খেয়েছি? রিমি শুধু ছোট্টকরে জবাব দিলো হ্যাঁ ও বলেছিলো। আবার বললাম-আচ্ছা তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেসা করবো বলে ভাবছিলাম।। বলতো তোমার বিয়ের দিন তুমি ওরকম হয়েছিলে কেন? দীর্ঘক্ষণ পর লক্ষ্য করলাম। রিমির মুখে একবিন্দু হাসি। মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল দিক-দিগন্তে। যেমনি মেঘলা আকাশে বিদ্যুতের একটু খানি ঝলকানি। নিমিষেই। অন্ধকার। ও বললো ভাইয়া আমরা মেয়ে। মানুষ। জীবনের প্রাথমিক সময় অতিবাহিত! হয়েছে বাবা-মায়ের সাথে। হঠাৎ তাদেরকে! ছেড়ে চলে আসতে হবে পরের ঘরে। আর কিছু বলো না। অঝোর ধারায় কাঁদছে। বললাম জানো? ও তোমাকে বিয়ের পাঁচ বছর পূর্ব থেকেই ভালবাসে। আবারো ছোট্ট উত্তর ও আমাকে বলেছিলো।
অশ্রুআপ্লুত নয়নে রিমি বললো-ভাইয়া তোমরা নাকি সেই শিশুকাল থেকেই একসাথে থেকেছো। ও যে কাজ করেনি তুমিও সেই কাজ করনি। এক মুহূর্তের জন্য নাকি তোমরা বিচ্ছিন্ন হওনি। কিন্তু আর বলতে পারলোনা, অসাধ্য আঁখি জল তার কোন বাঁধ মানছে না। আমি জানি ও যা বলতে চেয়েছিলো তার জবাব আমার কাছে নেই। আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না। হুহু করে কেঁদে দিলাম। কেন যেন মনে হচ্ছে। প্রিয় বন্ধু সজল আর বেঁচে নেই। বিবেক আমাকে বার বার দংশন করছে। আমি বন্ধুত্বের অপমান করেছি।এর কোন ক্ষমা নেই। নিজেকে সামলানোর ব্যার্থ প্রয়াস চালাইলাম। বাসের সমস্ত প্যাসেঞ্জারেরা আমাদেরকে লক্ষ্য করছে। কেউ হয়তো সববেদনা জানাতেই আমাকে নানান ধরনের প্রশ্ন করছে। রিমি ধরা গলায় বললো-ভাইয়া। তুমি কাঁদছো? আমার প্রশ্নের জবাব কই? আমিতো তোমার প্রশ্নের জবাব দিয়েছি। আমি নিজের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ একেবারেই হারিয়ে ফেললাম। বললাম বোন গো তোমার প্রশ্নের জবাব আমার কাছে নেই। আমি অপরাধী, আমাকে ক্ষমা করে দিও। গাড়ি এসে ঢাকায় থামলো। চললাম ঢাকা মেডিকেলের দিকে। রাস্তা যতই কমছে আতঙ্ক ততোই আমাকে আঁধারে ধরেছে। মেডিকেলের সেই দৃশ্য বর্ণনা করার মতো নয়। মাথা থেতলে গেছে। চেনার মতো কোন উপায় সেই। তবুও কষ্ট হলো না ওকে শণাক্ত করতে। ওর ডান হাতের কণিষ্ঠ আঙ্গুল ছিলো না। আমিই কেটে দিয়েছিলাম ছোট সময়ে। প্রাথমিক চিকিৎসায়ই সেরে যায় ওর হাত। কিন্তু আমাকেই থাকতে হয়েছিলো সাত দিন হাসপাতালে। ও বলেছিলো বন্ধু তুমি অযথাই চিন্তা করে অসুস্থ হয়ে পরেছো। এই দেখো আমার হাত ভাল হয়ে গেছে। বন্ধু তোমার আমার সম্পর্ক আদৌ ছিন্ন হবে না। সেই প্রিয় বন্ধু সজল আজ নিজেই ছিন্ন বিচ্ছিন্ন। কিন্তু সম্পর্ক? আমিই রাখতে পারিনি। চিৎকার দিয়ে বলেছিলাম সজল আমাকে ক্ষমা করে দিও। তারপর কি হয়েছে বলতে পারবো না। একসময় নিজেকে আবিষ্কার করলাম বিছানায়। পাশে বসা রিমি। বাঁধ ভাঙা অশ্রু ঝরছে তার চোখে। সামনেই সজলের লাশ। রিমিকে ডাকলাম। কোন জবাব পেলাম না। আবারো ডাকলাম, এবারো কোন জবাব নেই। বুঝতে পারলাম সজলের শোকে বাকরুদ্ধ। লাশ নিয়ে ফিরতে হবে। ওর জনম দুঃখী মা চেয়ে আছে কখন ফিরবে সজল: চিৎকার দিয়ে বললাম সজল। রিমির প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারিনি। আমি জানি পরকালে তোমার প্রশ্নের জবাবও আমি দিতে পারবো না। তোমার মায়ের প্রশ্নের জবাবও আমার কাছে নেই। আমি অপরাধী। আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি ভাবি হায়রে যান্ত্রিক শহর। তোমার এই পিচঢালা পথে পিষ্ট হচ্ছে কতজনের প্রিয় বন্ধু। কতজনের ভালবাসা, কতমায়ের সন্তান? এর জবাব কি কেউ দিতে পারবে? গাড়ি চলছে বাড়ির উদ্দেশ্যে। জানি না ওর মায়ের শেষ চিৎকার আমি থামাতে পারবো কিনা? কিন্তু আমি আজো খুঁজি আমার সেই প্রিয় বন্ধুকে এ পিচঢালা পথে পিষ্ট সকল ব্যক্তিদের মাঝে। যেন এরা সবাই আমার সেই প্রিয় বন্ধু সজল।
লেখক
মোঃমাহবুবুল আলম ফারুকী
শিক্ষার্থী
তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা।