সুমনের ঈদ
মাহবুবুল আলম ফারুকী
দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলমানদের নিকট আগমন করে পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদ মানে আনন্দ । ধনী, দরীদ্র ,আবাল বৃদ্ধ সবাই মেতে উঠে ঈদের আনন্দে । আজ গ্রামময় চলছে ঈদ উৎসব। চলছে বিচিত্র সব খানাপিনার আয়োজন। কিন্তু সাত বছরের বালক সুমনদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। মেঝেতেই পড়ে আছে লাচ্ছা সেমাই ,পাশেই সুমনের পছন্দের আরো অনেক কিছু, চুলার ধারে পায়েশের জন্য আতপ চাল ও গরুর দুধ। কিন্তু চুলোর আগুন এখনো জ্বলেনি। সুমনের জন্মের এক মাস পূর্বেই সুমনের আব্বা মারা যান। সুমনের বড় ভাই শাহিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স করে।এই দুই সন্তান নিয়েই আছিয়া বেগমের ছোট সংসার। স্বামী মারা যাওয়ার পর আর্থিক অভাব অনটনের মাঝেও ছেলেদেরকে লেখাপড়া করাচ্ছেন। সুমন এবার তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ছে। সপ্তাহ খানিক পূর্বে শাহিন মায়ের কাছে ফোন করে বলেছিল মা আমি দু’য়েক দিনের মধ্যেই আসতেছি।তোমার জন্য দুইটা শাড়ি, সুমনের জন্য দু জোড়া সার্ট-প্যান্ট, এক জোড়া জুতা, একটা পান্জাবী কিনেছি এবং কিছু বই ও খেলনাও নিয়েছি। সেই সাথে ঈদের প্রয়োজনীয় সব কিছু আমি নিয়ে যাচ্ছি । তোমরা কোন চিন্তা করো না। মা বললো- পাগল ছেলে আমার! এতো কিছুর কি প্রয়োজন ছিলো? তোর জন্য কি নিয়েছিস? শাহিনের সরল জবাব মা আমার প্রয়োজন ছিলো না তবুও একটা পান্জাবী নিয়েছি। এভাবে মা ছেলে অনেক কথা হয়। কে জানতো এটাই তাদের শেষ কথা!
সুমন যখন শুনেছে তার ভাইয়া তার চাহিদার সব কিনে নিয়ে আসতেছে তখন থেকেই রাস্তায় গিয়ে বসে থাকে।খেয়ে আবার না খেয়ে ২৫শে রমজান থেকে রাস্তায় বসে থাকে। ঢাকা থেকে সবাই ফিরলেও শাহিন এখনো ফিরে নাই। শিশুসুলভ কখনো সুমন বসে বসে কেঁদে দেয়। পথচারীকে জিজ্ঞেস করে ভাইয়া আসে না কেন? অনেকে বিরক্ত হয়ে চলে যায় কেউবা আবার বলে আসতেছে।সবাই যখন চাঁদ দেখায় ব্যাস্ত সুমন তখনো ভাইয়া আসার অপেক্ষায় রাস্তার পানে চেয়ে। পশ্চিমাকাশে ঈদের চাঁদ উঁকি দিয়েছে কিন্তু শাহিনের ।এখনো কোন খবর নেই। সুমন কেঁদে কেঁদে মাকে বলে মা ভাইয়া বুঝি আর আসবেনা।মা শান্তনা দেয় আসবে বাবা অপেক্ষা করো। ছেলেকে শান্তনা দিলেও নিজের মনেও একই প্রশ্ন ছেলে কি আসলেই আসব? নাকি কোন সমস্যা হলো?
ঈদের দিন সকাল। ঘরে ঘরে ঈদের নানা আয়োজন। শুধুই নিরব নিস্তব্ধ হয়ে আছে আছিয়া বেগমের সংসার।তার ভাবনার শেষ নেই। কয়েকটা দিন থেকেই আছিয়া বেগমের মনটা কেমন যেন নানান রকমের দুচিন্তায় মগ্ন। এই কতদিন মনকে বুঝাতে পারলেও আজ আর কোন বাধা মানছে না। গলাকাটা মুরগীর মত ছটফট করছে।
সুমন ঈদগাহে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে বসে আছে আর ভাবছে এখনই ভাইয়া এসে বলবে চল সুমন আগে নামাজটা পড়ে আসি। কিন্তু কই ? সুমন রাস্তায় চলে এলো । দলে দলে লোক ঈদগাহের দিকে যাচ্ছে । কিন্তু কিছু লোক কি যেনো একটা কাঁধে নিয়ে আসতেছে।সুমনের অবুঝ মন বলে দিলো ওই তো তোর ভাইয়া আসতেছে । সুমন পাগলের মত দৌড়াচ্ছে । লোকজন চেয়ে আছে তার দিকে । লোকজন চেয়ে আছে তার দিকে । কেউ হয়তো থামিয়ে প্রশ্ন করছে কি হয়েছেরে সুমন?
হ্যাঁ ! এটা লাশের কফিন । সুমন প্রশ্ন করে এটা কার লাশ নিয়ে আসছেন ? এটা কি শাহিন ভাইয়ার লাশ? কেউ কোন জবাব দেয়না। লাশ বাড়িতে পৌছলে মা ও সুমনের আর্তনাতে পরিবেশটা আনন্দের পরিবর্তে নেমে এলো অমানিশার ঘোর অন্ধকার। কফিনে শাহিনের রক্তাক্ত লাশ । চারদিন হলে অবরুদ্ধ কি নির্মম ভাবেই না তাকে হত্যা করা হয়েছে। সুমন জানে না ভাইয়ার কি দোষ ছিলো ? শুধু জানে তার চাহিদার চেয়ে বেশি এনেছে বিনিময়ে ভাইয়াকে হাড়াইছে। সেতো জানে না তার ভাই শুধু বলেছিল বাংলাদেশ নিয়ে ভারতকে নিয়ে বলেছিল “কে বলে হিন্দুস্তান আমাদের কোন প্রতিদান দেয়না। এইযে ৫০০ টন ইলিশ পাওয়ামাত্র ফারাক্কা খুলে দিছে। এখন আমরা মনের সুখে পানি খাবো আর বেশি বেশি ইলিশ পালবো। ইনশাল্লাহ আগামী বছর এক্কেবারে ১০০১ টন ইলিশ পাঠাবো।“