রৌমারী - কুড়িগ্রাম ০৪:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ভারটেক্স মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা ও নবীনবরণ অনুষ্ঠিত মণিরামপুরে প্রশিক্ষণ শেষে উপকরণ ও উৎসাহ বোনাস বিতরণে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবুল হাশেমের জানাজা সম্পন্ন, শোকের ছায়া রৌমারীতে ঝালকাঠিতে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ-২৬  প্রতিযোগিতায় বক্তৃতায় জেলায় প্রথম স্থান আফিয়া তাসনিম রৌমারীতে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে মোবাইল কোর্ট, জরিমানা ২৫ হাজার টাকা সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের দুই নেতার পদত্যাগ গাজীপুরের কালিয়াকৈরে মাদ্রাসা ও এতিম শীতার্ত শিক্ষার্থীদের মাঝে কম্বল বিতরণ অনুষ্ঠান Protest Rally Held in Pirojpur Against the Killing of Swechchhasebak Dal Leader Musabbir স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদে পিরোজপুরে বিক্ষোভ Alhaj Mostafizur Rahman Mostak Emphasizes Development and Public Welfare in Kurigram-4
সর্বশেষ সংবাদ :
ভারটেক্স মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা ও নবীনবরণ অনুষ্ঠিত মণিরামপুরে প্রশিক্ষণ শেষে উপকরণ ও উৎসাহ বোনাস বিতরণে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবুল হাশেমের জানাজা সম্পন্ন, শোকের ছায়া রৌমারীতে ঝালকাঠিতে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ-২৬  প্রতিযোগিতায় বক্তৃতায় জেলায় প্রথম স্থান আফিয়া তাসনিম রৌমারীতে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে মোবাইল কোর্ট, জরিমানা ২৫ হাজার টাকা সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের দুই নেতার পদত্যাগ গাজীপুরের কালিয়াকৈরে মাদ্রাসা ও এতিম শীতার্ত শিক্ষার্থীদের মাঝে কম্বল বিতরণ অনুষ্ঠান Protest Rally Held in Pirojpur Against the Killing of Swechchhasebak Dal Leader Musabbir স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদে পিরোজপুরে বিক্ষোভ Alhaj Mostafizur Rahman Mostak Emphasizes Development and Public Welfare in Kurigram-4

রৌমারীর কিংবদন্তি কিশমত আলী

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:১৬:৩৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৩৫ Time View

কিসমত আলী

৪৩

একটি অবহেলিত জনপদ থেকে উঠে আসা বাঙালির সাহস ও আত্মমর্যাদার ইতিহাস

উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক জনপদ রৌমারী—যেখানে নদী ভাঙন, দারিদ্র্য আর অবহেলা যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের নিত্যসঙ্গী। এই জনপদের মানুষ স্বপ্ন দেখতে জানে, কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ খুব কমই পায়। ঠিক এই রৌমারীর মাটিতেই জন্ম নিয়েছিলেন এক দুরন্ত সাহসী কিশোর—কিশমত আলী। যাঁর মুষ্টিতে ছিল ঝড়ের গতি, আর চোখে ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরা এক নিঃশব্দ চ্যালেঞ্জ।
আজ যাঁকে আমরা সম্মান আর ভালোবাসায় কিশমত মাস্টার বলে ডাকি, একসময় তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় মুষ্টিযুদ্ধ দলের ভরসার নাম। তাঁর জন্ম কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার প্রত্যন্ত পাখীউড়া গ্রামে—যে গ্রাম তখনো বিদ্যুৎ, যোগাযোগ আর সুযোগ–সুবিধার আলো থেকে অনেক দূরে।

করাচীর রিংয়ে বাঙালির গর্জন

১৯৬৭ সাল। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় পূর্ব পাকিস্তান তখনও অবহেলিত, বৈষম্যের শিকার। ঠিক এই সময় করাচীতে অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় মুষ্টিযুদ্ধ প্রতিযোগিতা। ২৫ থেকে ২৭ মে—মাত্র তিন দিনের এই আসরটি হয়ে ওঠে ইতিহাস বদলে দেওয়ার মঞ্চ।
এর আগ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের মুষ্টিযোদ্ধারা জাতীয় পর্যায়ে অংশ নিয়ে প্রায়শই শুধু ‘ঘুষি খেয়ে ফিরে আসা’ প্রতিযোগী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানের দাপট, সুযোগ–সুবিধা আর প্রশিক্ষণের কাছে তারা বারবার পরাজিত হয়েছেন। কিন্তু সেই ধারণা ভাঙতে রিংয়ে নামেন তরুণ কিশমত আলী।
করাচীর পুলিশ হেডকোয়ার্টার ময়দানে প্রতিযোগিতার প্রথম দিনেই ঘটে বিস্ময়কর ঘটনা। জুনিয়র গ্রুপে কিশমত আলীর প্রতিপক্ষ ছিলেন করাচী দলের অভিজ্ঞ ও অপরাজেয় মুষ্টিযোদ্ধা স্টিভেন্স আলফ্রেড—যিনি এর আগে কখনো হারেননি। কিন্তু সেই অপরাজেয়তার দেয়াল ভেঙে দেন পাখীউড়া গ্রামের এক তরুণ।
কিশমত আলীর ক্ষিপ্র পা চালনা, নিখুঁত ডজ, বজ্রকঠিন কাউন্টার পাঞ্চে আলফ্রেড দিশেহারা হয়ে পড়েন। কয়েক রাউন্ডের মধ্যেই রিং স্পষ্ট করে দেয়—আজ ইতিহাস লেখা হচ্ছে। আলফ্রেডের পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে করাচীর গ্যালারি ফেটে পড়ে উচ্ছ্বাসে। পশ্চিম পাকিস্তানের দর্শকরাই চিৎকার করে ওঠে—
“সাবাশ বাঙ্গালকা শের!”
সেই এক মুহূর্তে কিশমত আলী হয়ে ওঠেন কেবল একজন বিজয়ী বক্সার নন, তিনি হয়ে ওঠেন অবহেলিত পূর্ব পাকিস্তানের আত্মমর্যাদার প্রতীক।

পত্রিকার শিরোনামে এক গ্রামবাংলার নাম

পরদিনই পশ্চিম পাকিস্তানের একাধিক পত্রপত্রিকায় কিশমত আলীর ক্রীড়া নৈপুণ্যের ভূয়সী প্রশংসা প্রকাশিত হয়। লেখা হয়—এই তরুণ মুষ্টিযোদ্ধার সামনে রয়েছে এক উজ্জ্বল আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ। পূর্ব পাকিস্তানের দল—কিশমত আলী, রোডনি রোজেনরোড ও মোহাম্মদ শরীফ—যে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছিলেন, তা তৎকালীন প্রাদেশিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকে।
কিন্তু নিয়তি যেন বড় নির্মম। এই সাফল্যই হয়ে দাঁড়ায় তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় মোড়।

সম্ভাবনার অকাল থামা

কিশমত আলী ছিলেন বাবা–মায়ের ছোট সন্তান। পরিবারের আদরের এই ছেলেকে নিয়ে উদ্বেগ ছিল স্বাভাবিক। তাঁর বড় ভাই মরহুম ইমান আলী—বুয়েটের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক—পত্রিকার পাতায় ছোট ভাইয়ের খবর পড়ে আতঙ্কিত হন। খেলাধুলার ঝুঁকি, দূরদেশে যাওয়া, আঘাত—সব মিলিয়ে তিনি আশঙ্কা করেন ছোট ভাইকে হারানোর।
ভাইয়ের ভবিষ্যৎ রক্ষার চিন্তায় তিনি কৌশলে কিশমত আলীকে ঢাকায় নিজের বাসায় নিয়ে গিয়ে প্রায় ১০ দিন ঘরে আটকে রাখেন। এরপর তাঁকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে নীরবে বন্ধ হয়ে যায় এক সম্ভাবনাময় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অধ্যায়।
বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে কিশমত আলী তাই এক অপূর্ণ কিংবদন্তি—যাঁর মুষ্টিতে ছিল আরও বহু পদক জয়ের সামর্থ্য, কিন্তু পারিবারিক স্নেহ আর সময়ের বাস্তবতায় তা আর সম্ভব হয়নি।

মুক্তিযুদ্ধ থেকে শ্রেণিকক্ষ

কিন্তু কিশমত আলী জীবনের লড়াই থামাননি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি দেশের ডাকে সাড়া দেন। অস্ত্র হাতে নেন স্বাধীনতার জন্য। যুদ্ধ শেষে তিনি বেছে নেন মানুষ গড়ার পথ।
স্বাধীনতার পর তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। জীবনের বাকি সময়টা কাটান শিশুদের হাতে কলম তুলে দিয়ে, নৈতিকতা আর দেশপ্রেমের শিক্ষা দিয়ে। রিংয়ের সেই বাঘা বাঘা প্রতিপক্ষের বদলে এবার তাঁর সামনে ছিল কোমলমতি শিক্ষার্থীরা—কিন্তু নিষ্ঠা আর দায়িত্ববোধ ছিল সমান দৃঢ়।
আজ বয়সের ভারে নত হলেও তাঁর চোখে এখনো ভাসে করাচীর সেই রিং, দর্শকদের গর্জন, আর বাঙালির প্রথম বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর মুহূর্ত।

দুই ভাই, দুই পথ—একই গৌরব

রৌমারীর ইতিহাসে কিশমত আলী একা নন। তাঁর বড় ভাই মরহুম ইমান আলী প্রমাণ করেছেন—এই অবহেলিত জনপদ থেকেও বিশ্বমানের শিক্ষাবিদ হওয়া সম্ভব। ব্রিটিশ শাসনামলের কঠিন বাস্তবতা পেরিয়ে তিনি বুয়েটের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হন, গণিত বিষয়ে রচনা করেন ৬টি গবেষণামূলক গ্রন্থ এবং অর্জন করেন নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক।
একজন রিংয়ে বাঙালির সম্মান রক্ষা করেছেন, অন্যজন শ্রেণিকক্ষে জ্ঞানের আলো জ্বেলেছেন। এই দুই ভাই রৌমারীর জন্য শুধু ব্যক্তি নন—তাঁরা ইতিহাস।

উপসংহার

কিশমত আলী আমাদের মনে করিয়ে দেন—সব নায়ক ট্রফি হাতে ছবি তোলেন না, সব কিংবদন্তি পাঠ্যবইয়ে লেখা থাকে না। কেউ কেউ নীরবে ইতিহাস রচনা করেন, তারপর সময়ের আড়ালে হারিয়ে যান।
রৌমারীর মাটিতে তাই আজও তাঁর নাম উচ্চারণ করলে গর্বে বুক ভরে ওঠে—
তিনি আমাদের কিংবদন্তি,
তিনি আমাদের অহংকার,
তিনি কিশমত আলী।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আলোচিত সংবাদ

ভারটেক্স মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা ও নবীনবরণ অনুষ্ঠিত

রৌমারীর কিংবদন্তি কিশমত আলী

Update Time : ০২:১৬:৩৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫
৪৩

একটি অবহেলিত জনপদ থেকে উঠে আসা বাঙালির সাহস ও আত্মমর্যাদার ইতিহাস

উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক জনপদ রৌমারী—যেখানে নদী ভাঙন, দারিদ্র্য আর অবহেলা যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের নিত্যসঙ্গী। এই জনপদের মানুষ স্বপ্ন দেখতে জানে, কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ খুব কমই পায়। ঠিক এই রৌমারীর মাটিতেই জন্ম নিয়েছিলেন এক দুরন্ত সাহসী কিশোর—কিশমত আলী। যাঁর মুষ্টিতে ছিল ঝড়ের গতি, আর চোখে ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরা এক নিঃশব্দ চ্যালেঞ্জ।
আজ যাঁকে আমরা সম্মান আর ভালোবাসায় কিশমত মাস্টার বলে ডাকি, একসময় তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় মুষ্টিযুদ্ধ দলের ভরসার নাম। তাঁর জন্ম কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার প্রত্যন্ত পাখীউড়া গ্রামে—যে গ্রাম তখনো বিদ্যুৎ, যোগাযোগ আর সুযোগ–সুবিধার আলো থেকে অনেক দূরে।

করাচীর রিংয়ে বাঙালির গর্জন

১৯৬৭ সাল। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় পূর্ব পাকিস্তান তখনও অবহেলিত, বৈষম্যের শিকার। ঠিক এই সময় করাচীতে অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় মুষ্টিযুদ্ধ প্রতিযোগিতা। ২৫ থেকে ২৭ মে—মাত্র তিন দিনের এই আসরটি হয়ে ওঠে ইতিহাস বদলে দেওয়ার মঞ্চ।
এর আগ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের মুষ্টিযোদ্ধারা জাতীয় পর্যায়ে অংশ নিয়ে প্রায়শই শুধু ‘ঘুষি খেয়ে ফিরে আসা’ প্রতিযোগী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানের দাপট, সুযোগ–সুবিধা আর প্রশিক্ষণের কাছে তারা বারবার পরাজিত হয়েছেন। কিন্তু সেই ধারণা ভাঙতে রিংয়ে নামেন তরুণ কিশমত আলী।
করাচীর পুলিশ হেডকোয়ার্টার ময়দানে প্রতিযোগিতার প্রথম দিনেই ঘটে বিস্ময়কর ঘটনা। জুনিয়র গ্রুপে কিশমত আলীর প্রতিপক্ষ ছিলেন করাচী দলের অভিজ্ঞ ও অপরাজেয় মুষ্টিযোদ্ধা স্টিভেন্স আলফ্রেড—যিনি এর আগে কখনো হারেননি। কিন্তু সেই অপরাজেয়তার দেয়াল ভেঙে দেন পাখীউড়া গ্রামের এক তরুণ।
কিশমত আলীর ক্ষিপ্র পা চালনা, নিখুঁত ডজ, বজ্রকঠিন কাউন্টার পাঞ্চে আলফ্রেড দিশেহারা হয়ে পড়েন। কয়েক রাউন্ডের মধ্যেই রিং স্পষ্ট করে দেয়—আজ ইতিহাস লেখা হচ্ছে। আলফ্রেডের পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে করাচীর গ্যালারি ফেটে পড়ে উচ্ছ্বাসে। পশ্চিম পাকিস্তানের দর্শকরাই চিৎকার করে ওঠে—
“সাবাশ বাঙ্গালকা শের!”
সেই এক মুহূর্তে কিশমত আলী হয়ে ওঠেন কেবল একজন বিজয়ী বক্সার নন, তিনি হয়ে ওঠেন অবহেলিত পূর্ব পাকিস্তানের আত্মমর্যাদার প্রতীক।

পত্রিকার শিরোনামে এক গ্রামবাংলার নাম

পরদিনই পশ্চিম পাকিস্তানের একাধিক পত্রপত্রিকায় কিশমত আলীর ক্রীড়া নৈপুণ্যের ভূয়সী প্রশংসা প্রকাশিত হয়। লেখা হয়—এই তরুণ মুষ্টিযোদ্ধার সামনে রয়েছে এক উজ্জ্বল আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ। পূর্ব পাকিস্তানের দল—কিশমত আলী, রোডনি রোজেনরোড ও মোহাম্মদ শরীফ—যে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছিলেন, তা তৎকালীন প্রাদেশিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকে।
কিন্তু নিয়তি যেন বড় নির্মম। এই সাফল্যই হয়ে দাঁড়ায় তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় মোড়।

সম্ভাবনার অকাল থামা

কিশমত আলী ছিলেন বাবা–মায়ের ছোট সন্তান। পরিবারের আদরের এই ছেলেকে নিয়ে উদ্বেগ ছিল স্বাভাবিক। তাঁর বড় ভাই মরহুম ইমান আলী—বুয়েটের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক—পত্রিকার পাতায় ছোট ভাইয়ের খবর পড়ে আতঙ্কিত হন। খেলাধুলার ঝুঁকি, দূরদেশে যাওয়া, আঘাত—সব মিলিয়ে তিনি আশঙ্কা করেন ছোট ভাইকে হারানোর।
ভাইয়ের ভবিষ্যৎ রক্ষার চিন্তায় তিনি কৌশলে কিশমত আলীকে ঢাকায় নিজের বাসায় নিয়ে গিয়ে প্রায় ১০ দিন ঘরে আটকে রাখেন। এরপর তাঁকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে নীরবে বন্ধ হয়ে যায় এক সম্ভাবনাময় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অধ্যায়।
বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে কিশমত আলী তাই এক অপূর্ণ কিংবদন্তি—যাঁর মুষ্টিতে ছিল আরও বহু পদক জয়ের সামর্থ্য, কিন্তু পারিবারিক স্নেহ আর সময়ের বাস্তবতায় তা আর সম্ভব হয়নি।

মুক্তিযুদ্ধ থেকে শ্রেণিকক্ষ

কিন্তু কিশমত আলী জীবনের লড়াই থামাননি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি দেশের ডাকে সাড়া দেন। অস্ত্র হাতে নেন স্বাধীনতার জন্য। যুদ্ধ শেষে তিনি বেছে নেন মানুষ গড়ার পথ।
স্বাধীনতার পর তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। জীবনের বাকি সময়টা কাটান শিশুদের হাতে কলম তুলে দিয়ে, নৈতিকতা আর দেশপ্রেমের শিক্ষা দিয়ে। রিংয়ের সেই বাঘা বাঘা প্রতিপক্ষের বদলে এবার তাঁর সামনে ছিল কোমলমতি শিক্ষার্থীরা—কিন্তু নিষ্ঠা আর দায়িত্ববোধ ছিল সমান দৃঢ়।
আজ বয়সের ভারে নত হলেও তাঁর চোখে এখনো ভাসে করাচীর সেই রিং, দর্শকদের গর্জন, আর বাঙালির প্রথম বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর মুহূর্ত।

দুই ভাই, দুই পথ—একই গৌরব

রৌমারীর ইতিহাসে কিশমত আলী একা নন। তাঁর বড় ভাই মরহুম ইমান আলী প্রমাণ করেছেন—এই অবহেলিত জনপদ থেকেও বিশ্বমানের শিক্ষাবিদ হওয়া সম্ভব। ব্রিটিশ শাসনামলের কঠিন বাস্তবতা পেরিয়ে তিনি বুয়েটের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হন, গণিত বিষয়ে রচনা করেন ৬টি গবেষণামূলক গ্রন্থ এবং অর্জন করেন নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক।
একজন রিংয়ে বাঙালির সম্মান রক্ষা করেছেন, অন্যজন শ্রেণিকক্ষে জ্ঞানের আলো জ্বেলেছেন। এই দুই ভাই রৌমারীর জন্য শুধু ব্যক্তি নন—তাঁরা ইতিহাস।

উপসংহার

কিশমত আলী আমাদের মনে করিয়ে দেন—সব নায়ক ট্রফি হাতে ছবি তোলেন না, সব কিংবদন্তি পাঠ্যবইয়ে লেখা থাকে না। কেউ কেউ নীরবে ইতিহাস রচনা করেন, তারপর সময়ের আড়ালে হারিয়ে যান।
রৌমারীর মাটিতে তাই আজও তাঁর নাম উচ্চারণ করলে গর্বে বুক ভরে ওঠে—
তিনি আমাদের কিংবদন্তি,
তিনি আমাদের অহংকার,
তিনি কিশমত আলী।